বাংলা সাহিত্যের আকাশে নিভে গেল আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলা একাডেমি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত, প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশুমনের প্রিয় ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই। তাঁর কলমে যে ছন্দ, যে আনন্দ, যে কল্পনার রং লেগে ছিল—তা আজ স্মৃতির পাতায় বন্দী।
শনিবার (২ জানুয়ারি ২০২৬) ভোর ৬টা ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরায় অবস্থিত জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই ছড়ার জাদুকর।
সুকুমার বড়ুয়ার মৃত্যুতে বাংলা শিশুসাহিত্য এক অপূরণীয় শূন্যতার মুখোমুখি হলো—যে শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে বিদায়
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে মস্তিষ্কে স্ট্রোক হওয়ার পর সুকুমার বড়ুয়ার ডান পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকেই তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে শুরু করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যোগ হয় হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতা।
চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকলেও বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ধীরে ধীরে তাঁকে আরও ক্লান্ত করে তোলে। শেষ দিকে শারীরিক অবস্থা গুরুতর হলে তাঁকে গহিরার জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই জীবনের দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রার ইতি টানেন তিনি।
তাঁর মেয়ে অঞ্জনা বড়ুয়া বাবার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন,
“বাবা অনেক দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। আমরা জানতাম সময়টা সহজ নয়, কিন্তু এমন বিদায় মানতে কষ্ট হচ্ছে।”
শিকড়ের টানে বেড়ে ওঠা: শৈশব ও জন্মপরিচয়
সুকুমার বড়ুয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি, চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে। গ্রামীণ প্রকৃতি, নদী, মাঠ, মানুষের সহজ জীবন—এসবই তাঁর শৈশবের অংশ ছিল। এই শিকড়ের টানই পরবর্তী সময়ে তাঁর ছড়ার ভেতর প্রাণ হয়ে ফিরে এসেছে।
তাঁর বাবা সর্বানন্দ বড়ুয়া এবং মা কিরণ বালা বড়ুয়া ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। পরিবার থেকেই তিনি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ পান। শৈশব থেকেই ছন্দ, শব্দ আর গল্পের প্রতি তাঁর আলাদা আকর্ষণ ছিল।
গ্রামের পাঠশালা থেকে শুরু করে শহরের শিক্ষাজীবন—সবখানেই তিনি ছিলেন শান্ত, বিনয়ী কিন্তু কৌতূহলী এক ছাত্র।
কর্মজীবন ও সংগ্রামের অধ্যায়
সুকুমার বড়ুয়ার কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬২ সালে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাওয়াটা সহজ ছিল না।
দিনভর কাজ, সীমিত আয়, পারিবারিক দায়িত্ব—সবকিছুর মধ্যেও তিনি ছড়া লেখা ছাড়েননি। রাতের নির্জনতায়, ছুটির দিনে কিংবা ক্লান্ত শরীর নিয়েও তিনি লিখেছেন।
দীর্ঘ প্রায় ৩৭ বছরের চাকরি জীবনের শেষে ১৯৯৯ সালে স্টোরকিপার হিসেবে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি আরও বেশি সময় দিতে পারেন সাহিত্যকে। তখনই তাঁর ছড়ার জগৎ আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে।
ছড়ার ভেতর দিয়ে শিশুমনের ভাষা
সুকুমার বড়ুয়ার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি শিশুদের মানুষ ছিলেন। তাঁর লেখা ছড়াগুলো কখনো উপদেশমূলক হয়ে ওঠেনি, আবার কখনো কৃত্রিম আনন্দে ভরেনি। সহজ ভাষা, জীবন্ত কল্পনা আর ছন্দের স্বতঃস্ফূর্ততায় তিনি শিশুদের আপন করে নিয়েছেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
“শিশুসাহিত্য মানে ছোট করে লেখা নয়, বরং শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখা।”
এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
ছয় দশকের সাহিত্যযাত্রা
প্রায় ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি নিয়মিত ছড়া রচনা করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর লেখা হাজারের বেশি ছড়া প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকা, সাময়িকী ও গ্রন্থে।
তার লেখায় পাওয়া যায়—
-
শিশুর কৌতূহল
-
প্রকৃতির রূপ
-
প্রাণীর গল্প
-
হাস্যরস
-
আবার কখনো নরম আবেগ
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ
সুকুমার বড়ুয়ার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা কয়েক ডজনেরও বেশি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
-
লেজ আবিষ্কার
-
ছোটদের হাট
-
কোয়াল খাইয়ে
-
ঠিক আছে ঠিক আছে
-
পাগলা ঘোড়া
-
ভিজে বেড়াল
-
চন্দনা রঞ্জনার ছড়া
-
এলোপাতাড়ি
-
নানা রঙের দিন
-
সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া
-
চিচিং ফাঁক
-
কিছু না কিছু
-
প্রিয় ছড়া শতক
-
নদীর খেলা
-
মজার পড়া ১০০ ছড়া
-
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়াসম্ভার (দুই খণ্ড)
-
যুক্তবর্ণ
-
চন্দনার পাঠশালা
-
জীবনের ভেতরে বাইরে
এই বইগুলো আজও শিশুদের বইয়ের তাকের অমূল্য সম্পদ।
পুরস্কার ও সম্মাননা
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার—
-
একুশে পদক (২০১৭)
-
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার
-
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার
-
আলাওল সাহিত্য পুরস্কার
-
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সম্মাননা
-
অবসর সাহিত্য পুরস্কার
-
আনন ফাউন্ডেশন আজীবন সম্মাননা
-
চন্দ্রাবতী শিশুসাহিত্য পুরস্কার
এই সম্মাননাগুলো তাঁর সাহিত্যজীবনের সাক্ষ্য বহন করে।
শোকের ছায়া: সাহিত্য ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া
সুকুমার বড়ুয়ার প্রয়াণে দেশের সাহিত্যাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কবি, লেখক, পাঠক—সবাই স্মরণ করছেন তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায়।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সংসদ সদস্য গোলাম আকবর খোন্দকার এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন—
“সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল ছড়াকার। তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন সত্যিকারের সাহিত্যসাধককে হারালাম।”
পারিবারিক জীবন
সুকুমার বড়ুয়া রেখে গেছেন—
-
স্ত্রী
-
তিন কন্যা
-
এক পুত্র
-
অসংখ্য গুণগ্রাহী, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী
পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্নেহশীল বাবা, আর বাইরের জগতে ছিলেন ছড়ার জাদুকর।
উত্তরাধিকার ও অমরতা
সুকুমার বড়ুয়া চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর লেখা ছড়া রয়ে গেছে। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন শিশুরা হাসবে, ততদিন তাঁর ছন্দ বেঁচে থাকবে।
তিনি প্রমাণ করে গেছেন—
ছড়া ছোট হতে পারে,
কিন্তু তার প্রভাব বিশাল।
বিদায় ছড়ার জাদুকর
আপনি নেই, কিন্তু আপনার ছন্দ আছে
শিশুমনের হাসিতে,
পাতার ফাঁকে,
বাংলা সাহিত্যের হৃদয়ে।