হঠাৎ ভয়াবহ শীতের তাপমাত্রা: কুয়াশায় থমকে গেছে দেশ, কষ্টে মানুষ

ডিসেম্বরের শেষভাগে এসে শীতের তীব্রতা দেশের সর্বত্র নতুন মাত্রা পেয়েছে। ঘন কুয়াশা, সূর্যের অনুপস্থিতি ও হিমেল বাতাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শহর ও গ্রামের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। উত্তর, উত্তর-পশ্চিম থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত শীতের দাপটে কর্মজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের নিকলীতে গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস—যা চলতি মৌসুমে শীতের প্রকোপের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কুয়াশায় ঢাকা সকাল, থমকে গেছে কর্মচাঞ্চল্য

ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় চারপাশ। নদী, খাল-বিল ও হাওরাঞ্চলে কুয়াশার আস্তরণ আরও ঘন হয়ে ওঠে। খুলনার দৌলতপুর, বগুড়ার যশোপাড়া কিংবা মেহেরপুরের কোর্ট মোড়—সবখানেই একই চিত্র। কুয়াশা ভেদ করে কাজে বেরোনো মানুষের মুখে আতঙ্ক আর ক্লান্তি স্পষ্ট। অনেক জায়গায় সূর্যের দেখা মেলে বেলা গড়ানোর পর, তাও আবার ক্ষণিকের জন্য।

হাওরাঞ্চলে শীতের বাড়তি চাপ

কিশোরগঞ্জের নিকলীর কুর্শা এলাকার বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী ফারুক মিয়ার মতো অনেকের জীবন এখন কার্যত স্থবির। বোরো ধানের চারা রোপণের ভরা মৌসুম হলেও টানা শীত আর কুয়াশার কারণে মাঠে নামতে পারছেন না তারা। কম্বল মুড়িয়ে চায়ের দোকানে বসে সময় কাটাতে হচ্ছে। ফারুক মিয়া বলেন, জীবনের এই বয়সে এমন কনকনে শীত আগে খুব একটা অনুভব করেননি। ঠান্ডায় শরীর অবশ হয়ে আসে, কাজ করার শক্তি কমে যায়।

নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট সবচেয়ে বেশি

শীতের এই তীব্রতা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের ওপর। মেহেরপুর শহরের রিকশাচালক আবদুল মালেক জানান, ভোরবেলা রাস্তায় নামতেই হাত-পা জমে যায়। যাত্রী কম থাকায় আয়ও কমেছে। সংসারের খরচ চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।

উত্তরের জেলাগুলোতে শীতের তীব্রতা

দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে শীত আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। টানা মেঘাচ্ছন্ন আকাশের কারণে দিনের বেলা সূর্য দেখা যাচ্ছে না। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, সকালে তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় শীতের অনুভূতি আরও বেড়েছে।

পাহাড়ি এলাকায় হিমেল বাতাসের প্রভাব

শেরপুরের গারো পাহাড়সংলগ্ন এলাকাগুলোতে শীতের তীব্রতা ভিন্ন মাত্রা নিয়েছে। সন্ধ্যার পর পাহাড়ি বাতাসের সঙ্গে কুয়াশার পানি পড়তে থাকে ঘরের চালের ওপর। নালিতাবাড়ীর কৃষিশ্রমিক সীতা দিও বলেন, ঠান্ডা উপেক্ষা করেই পেটের দায়ে কাজে বের হতে হয়। তবে এই শীতে শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, হাসপাতালে রোগীর চাপ

শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ উত্তরাঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর ভিড় দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

রাজশাহীর এক চিকিৎসক জানান, শীতের এই সময়টায় অ্যাজমা ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ঠান্ডায় থাকলে রক্তনালির সংকোচনজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা বয়স্কদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ সতর্কতা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময় শিশু ও বয়স্কদের উষ্ণ কাপড়ে ঢেকে রাখা জরুরি। ভোর ও গভীর রাতে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো। গরম খাবার গ্রহণ, কুসুম গরম পানি পান এবং প্রয়োজন ছাড়া ঠান্ডা পানির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কুয়াশার কারণে যোগাযোগে বিঘ্ন

ঘন কুয়াশার প্রভাবে সড়ক, নৌ ও বিমান যোগাযোগে সাময়িক বিঘ্ন ঘটছে। অনেক এলাকায় সকালবেলা যান চলাচল ধীর হয়ে যায়। দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চালকদের সতর্কভাবে চলাচলের আহ্বান জানিয়েছে।

শীত কেন এত বেশি অনুভূত হচ্ছে?

আবহাওয়াবিদদের মতে, চলতি ডিসেম্বরে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পশ্চিমা লঘুচাপ কম সক্রিয় থাকায় বৃষ্টিপাত হয়নি। বৃষ্টি না হওয়ায় কুয়াশা কাটছে না, বরং তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বাতাসের গতি কম থাকায় কুয়াশা জমে থেকে তাপমাত্রা আরও কম অনুভূত হচ্ছে।

কবে কমতে পারে শীত?

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কুয়াশার দাপট কিছুটা কমতে পারে। এর সঙ্গে সঙ্গে শীতের তীব্রতাও ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ততদিন পর্যন্ত সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

শীত মোকাবিলায় করণীয়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতজনিত ঝুঁকি কমাতে কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি—

  • পর্যাপ্ত গরম কাপড় ব্যবহার

  • ভোর ও গভীর রাতে বাইরে যাওয়া সীমিত রাখা

  • শিশু ও বয়স্কদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া

  • অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া

সার্বিক চিত্র

দেশজুড়ে চলমান এই শৈত্যপ্রবাহে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতার মাধ্যমে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষায় এখন গোটা দেশ।

Leave a Comment